জেলার ইতিহাস

নেত্রকোণা জেলা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর অঞ্চল। ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই জেলা প্রাচীনকাল থেকেই মানব বসতির জন্য উপযোগী ভূমি হিসেবে পরিচিত। গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই অঞ্চলে কংস, সোমেশ্বরী, গণেশ্বরী, মহেশ্বরী, গোরাউৎরা নদীসহ অন্যান্য শাখা নদী প্রবাহিত হয়েছে, যা জেলার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রগর্ভে মিশেছে।

নেত্রকোণা জেলার নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, “নেত্র” শব্দের অর্থ “চোখ” এবং “কোনা” শব্দের অর্থ “কোণ”। অর্থাৎ, “নেত্রকোণা” মানে “চোখের কোণ”। আরেকটি মত অনুযায়ী, এটি “নাটোরকোনা” থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “নাটোরের কোণ”। ১৮৮০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নেত্রকোণা মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৮২ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নামটি গৃহীত হয়।

১৯৮৪ সালে নেত্রকোণা জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত: আটপাড়া, বারহাট্টা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া, মদন, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোণা সদর এবং পূর্বধলা। এই জেলার আয়তন প্রায় ২৭৯৪.২৮ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২২,২২,৯৬৪। এখানে গারো, হাজং, হদি, বানাই প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।

নেত্রকোণা জেলা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিচিত। এখানে ধান, গম, পাট, সরিষা, কলা, কুমড়া, কমলা ইত্যাদি কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এছাড়া মাছ চাষ এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। এই জেলায় কয়লা, সিলেকশন বালি, চীনা মাটি (কেউলিন) এবং পাথরের মতো খনিজ সম্পদও রয়েছে।

নেত্রকোণা জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওর বর্ষাকালে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, যা “মিনি সাগর” নামে পরিচিত। শীতকালে এখানে অতিথি পাখির আগমন ঘটে, যা স্থানীয়দের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া, মদনপুরের হযরত শাহ্ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (র.) মাজার, শাহ্ সুখূল আম্বিয়া মাজার, পুকুরিয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গ প্রভৃতি ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে।

নেত্রকোণা জেলা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এই জেলা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।